Worldcup Countdown

00

DAYS

00

HOURS

00

MINUTES

00

SECONDS

Lionel Messi

লিওনেল মেসি

ফরোয়ার্ড
  • জাতীয়তা: আর্জেন্টাইন
  • মোট গোল: ১৩
  • মোট অ্যাসিস্ট:
  • মোট দলভুক্ত: ২৩
  • মোট খেলা: ২৩
  • বয়স: ৩৮
  • উচ্চতা: ৫৮৮ মিটার
  • ওজন: ৬৭ কেজি
  • পা: বাম পা
  • হলুদ কার্ড:
  • লাল কার্ড:

ফরোয়ার্ড

লিওনেল আন্দ্রেস মেসিকে ডাকা হয় ‘দ্য অ্যাটমিক ফ্লি’ নামে। উচ্চতায় ছোট, কিন্তু কীর্তিতে আকাশছোঁয়া। ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, যারা খেলার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। কিন্তু লিওনেল মেসিকে নিয়ে আলোচনা উঠলেই যেন সব তুলনা থেমে যায়। কারণ তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি এক যুগের নাম।

২০২২ সালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মেসি, তখন মনে হয়েছিল ফুটবলের সবচেয়ে অসম্পূর্ণ গল্পটির শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে। বহু বছরের অপেক্ষা, ব্যর্থতা, সমালোচনা আর অপূর্ণতার পর অবশেষে বিশ্বকাপও নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি। অথচ সেখানেই থেমে যাননি। এখনও খেলছেন, এখনও গোল করছেন, এখনও বিস্ময় উপহার দিচ্ছেন।

তাই প্রশ্নটা এখনও রয়ে গেছে মেসি কি সত্যিই মানুষ?

শৈশব
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন লিওনেল মেসি। পরিবারে চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বাবা হোর্হে মেসি একটি স্টিল কারখানায় কাজ করতেন, আর মা সেলিয়া কুচিত্তিনি ছিলেন ম্যাগনেট কারখানার কর্মী।

খুব ছোট বয়স থেকেই ফুটবল ছিল তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মাত্র চার বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রানদোলিতে যোগ দেন তিনি, যেখানে তার বাবাই কোচের দায়িত্বে ছিলেন। পরে সাত বছর বয়সে যোগ দেন নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে। সেখানে বয়সভিত্তিক দলে তার গোলের ঝড় দ্রুতই তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

বার্সেলোনায় শুরু, ইতিহাসে পরিণতি
মাত্র ১৩ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা থেকে বার্সেলোনায় এসেছিলেন ছোটখাটো এক কিশোর। গ্রোথ হরমোন সমস্যার কারণে তার শারীরিক গড়ন ছিল অন্যদের তুলনায় অনেক ছোট। প্রথম দেখায় অনেকে সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু বল পায়ে নেওয়ার পর সব বদলে যায়।

সেই ছেলেটাই পরে বার্সেলোনার ইতিহাস বদলে দেন। ১৭টি মৌসুমে কাতালান ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন ৩৪টি শিরোপা। তার পায়ে বার্সেলোনা শুধু ট্রফিই জেতেনি, খেলেছে এমন এক ফুটবল, যেটিকে অনেকে সৌন্দর্যের শিল্প বলে মনে করেন।

বার্সেলোনার পর ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনে গিয়েও সফল ছিলেন। জিতেছেন টানা দুইটি লিগ ওয়ান শিরোপা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়ে ক্লাবটিকে এনে দেন ইতিহাসের প্রথম বড় ট্রফি।

ক্লাব ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত মেসির ট্রফি সংখ্যা ৪৮, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ।

আর্জেন্টিনার আকাশে এক অনন্ত নক্ষত্র
ক্লাব ফুটবলে সব জেতার পরও একটি আক্ষেপ বারবার তাড়া করত মেসিকে—বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার মানুষ দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে তাকে দেখলেও, বিশ্বকাপ না থাকায় সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি।

২০০৬ বিশ্বকাপে অভিষেকেই সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে গোল ও অ্যাসিস্ট করেছিলেন। তখনই বোঝা গিয়েছিল, নতুন এক অধ্যায়ের শুরু হয়েছে। কিন্তু জার্মানি বারবার আর্জেন্টিনার স্বপ্নভঙ্গ করে।

২০১০ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলেও গোল পাননি। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে তিনি প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। সেই আসরে তার ড্রিবল, গোল এবং নেতৃত্ব ছিল অসাধারণ। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হারতে হয়। ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকা মেসির সেই ছবিটি এখনও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে।

২০১৮ সালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায়ের পর মনে হচ্ছিল, হয়তো বিশ্বকাপ আর জেতা হবে না তার। কিন্তু ২০২২ সালে কাতারে যেন নিজের ভাগ্য নিজেই লিখলেন মেসি।

কাতারের মহাকাব্য
সৌদি আরবের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হার দিয়ে শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযান। সেই হারের পর পুরো দেশজুড়ে নেমে এসেছিল হতাশা। কিন্তু মেসি তখনও বিশ্বাস হারাননি।

মেক্সিকোর বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল করে তিনি দলকে ফিরিয়ে আনেন লড়াইয়ে। এরপর একে একে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা।

ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ফাইনাল এখন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অংশ। দুই গোল করেন মেসি। টাইব্রেকারে জয়ের পর অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি ওঠে তার হাতে। সেই মুহূর্তে যেন পূর্ণতা পায় এক কিংবদন্তির গল্প।

সংখ্যায় মেসির সাম্রাজ্য
ফুটবলে মেসির প্রভাব শুধু চোখের সৌন্দর্যে নয়, সংখ্যাতেও অবিশ্বাস্য। ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান ফুটবল ইতিহাসে প্রায় অতুলনীয়। তিনি জিতেছেন রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি’অর এবং ৬টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। এক ক্যালেন্ডার বছরে ৯১ গোল করার মতো অবিশ্বাস্য রেকর্ডও তার দখলে।

এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারে তিনি খেলেছেন ১১৫৪টি ম্যাচ। করেছেন ৯১০টি গোল এবং ৪১২টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ সরাসরি ১৩২২টি গোলে অবদান রেখেছেন। তার ক্যারিয়ারে রয়েছে ৬০টি হ্যাটট্রিক। পেনাল্টি থেকে করেছেন ১১৩টি গোল, আর ফ্রি-কিক থেকে এসেছে ৭১টি গোল।

শুধু গোল করাতেই নয়, সুযোগ তৈরিতেও তিনি অনন্য। এখন পর্যন্ত ৫৯১টি ‘বিগ চান্স’ তৈরি করেছেন মেসি। মাঠে তার প্রভাবের আরেকটি বড় প্রমাণ ৪৫০ বার হয়েছেন ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’।

বিশ্বকাপেও তার রেকর্ডগুলো অবিশ্বাস্য। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ, সবচেয়ে বেশি মিনিট এবং সবচেয়ে বেশি ম্যান অব দ্য ম্যাচ সবই তার দখলে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুইবার গোল্ডেন বল জেতা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি।

কিংবদন্তিদের চোখে মেসি
ফুটবল ইতিহাসের অনেক বড় বড় তারকাও মেসিকে দেখে বিস্মিত হয়েছেন।

  • হ্রিস্টো স্টইচকভ বলেছিলেন, “একসময় আমাকে থামাতে পিস্তল লাগত। এখন মেসিকে থামাতে মেশিনগান দরকার।”
  • জিয়ানলুইজি বুফন বলেছিলেন, “আমি তাকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম, নিশ্চিত হতে যে সে মানুষ।”
  • অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার মতে, “সে মানুষ নয়, ভিনগ্রহের কেউ।”
  • ওয়েইন রুনি বলেছিলেন, “মেসি একটা রসিকতা। আমার চোখে দেখা সেরা রসিকতা।”
  • রোনালদিনহো তো বলেই বসেছিলেন, “মেসি অবসর নিলে পুরো ফুটবলেরই ১০ নম্বর জার্সি তুলে রাখা উচিত।”

২০২৬, আরেকটি অসম্ভবের অপেক্ষা?
৬২ বছর ধরে কোনো দল টানা দুইটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। কিন্তু আর্জেন্টিনা এবারও স্বপ্ন দেখছে। কারণ দলটিতে এখনও আছেন মেসি।

কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটি এখন আরও পরিণত। গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, রক্ষণে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার—সব মিলিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এক দল।

আক্রমণে আছেন জুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ। যদিও অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার বিদায় বড় ধাক্কা, তবুও থিয়াগো আলমাদা, নিকো পাজ কিংবা তরুণ ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি খেলবেন কি না, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস বলছে, মেসিকে নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।

কারণ এই মানুষটি বারবার প্রমাণ করেছেন ‘অসম্ভব’ শব্দটা তার অভিধানে নেই।