
কিলিয়ান এমবাপ্পে
ফরোয়ার্ড ১০- জাতীয়তা:
- মোট গোল: ১২
- মোট অ্যাসিস্ট: ৩
- মোট দলভুক্ত: ১৪
- মোট খেলা: ১৪
- বয়স: ২৭
- উচ্চতা: ৫৮৮ মিটার
- ওজন: ০ কেজি
- পা: ডান পা
- হলুদ কার্ড: ০
- লাল কার্ড: ০
ফরোয়ার্ড
প্যারিসের উপকণ্ঠের ছোট্ট শহর বন্ডি থেকে শুরু। তারপর বিশ্বকাপের মঞ্চ, ইউরোপীয় ফুটবলের আলো ঝলমলে রাত আর কোটি সমর্থকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়া কিলিয়ান এমবাপ্পের গল্পটা যেন আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে সিনেম্যাটিক অধ্যায়গুলোর একটি।
মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন, যেখানে সাধারণত ফুটবলারদের পৌঁছাতে লেগে যায় পুরো ক্যারিয়ার। গতি, গোল, ট্রফি আর বড় ম্যাচের পারফরম্যান্স সব মিলিয়ে এমবাপ্পে এখন শুধু ফ্রান্সের নন, পুরো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুখগুলোর একজন।
বন্ডির ছেলে থেকে বিশ্বমঞ্চে
১৯৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর প্যারিসে জন্ম হলেও এমবাপ্পের বেড়ে ওঠা বন্ডিতে। পরিবারটাই ছিল খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত। বাবা উইলফ্রিড এমবাপ্পে ছিলেন ফুটবল কোচ, মা ফায়জা লামারি সাবেক হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। ফলে ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা ছিল তার জীবনের অংশ।
ফুটবলের প্রতি তার ঝোঁকটা এতটাই প্রবল ছিল যে অল্প বয়সেই তাকে ভর্তি করা হয় বিখ্যাত ক্লেয়ারফঁতেন একাডেমিতে। সেখান থেকেই তৈরি হতে থাকে ভবিষ্যতের সুপারস্টার।
শৈশবে তার ঘরের দেয়ালজুড়ে ছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পোস্টার। আদর্শ মানতেন থিয়েরি অঁরি, রোনালদিনহোদেরও। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই রিয়াল মাদ্রিদের ট্রেনিং ক্যাম্পে ডাক পাওয়া তার প্রতিভার প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
মোনাকোতে বিস্ফোরণ
২০১৩ সালে এএস মোনাকোর যুব দলে যোগ দেন এমবাপ্পে। ২০১৫ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিনিয়র দলে অভিষেক হয়। শুরু থেকেই তার গতি আর আত্মবিশ্বাস সবাইকে চমকে দেয়।
২০১৬-১৭ মৌসুমে ইউরোপীয় ফুটবলে যেন বিস্ফোরণ ঘটান তিনি। মোনাকোকে লিগ ওয়ান শিরোপা জেতানোর পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালেও তোলেন। ইউরোপ বুঝে যায়, নতুন এক সুপারস্টারের জন্ম হয়েছে।
পিএসজিতে গোলের বন্যা
২০১৭ সালে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ইউরোতে প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে যোগ দেন এমবাপ্পে। তখন তিনি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি তরুণ খেলোয়াড়।
পিএসজিতে এসে তিনি শুধু তারকা হননি, হয়ে উঠেছিলেন গোলমেশিন। ছয়টি লিগ শিরোপা, অসংখ্য কাপ, আর রেকর্ডের পর রেকর্ড। সময়ের সঙ্গে তিনি পিএসজির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়ে যান।
কিলিয়ান এমবাপ্পের পিএসজি অধ্যায়টা ছিল শুধু গোল আর ট্রফির গল্প নয়, আধুনিক ফরাসি ফুটবলে একক আধিপত্যের প্রতিচ্ছবি।
স্বপ্নের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ
দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার পর ২০২৪ সালে অবশেষে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এমবাপ্পে। শৈশবের স্বপ্নের ক্লাবে এসে শুরু করেন নতুন অধ্যায়।
মাদ্রিদের জার্সিতে শুরু থেকেই ছিলেন দুর্দান্ত। বড় ম্যাচে গোল, হ্যাটট্রিক, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে বাঁচানো সব মিলিয়ে খুব দ্রুতই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর নতুন নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি।
অনেকের চোখে, এটা শুধু একটি ট্রান্সফার ছিল না; বরং বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্র বদলের প্রতীক।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এমবাপ্পের রাজত্ব
ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে এমবাপ্পের যাত্রাটাও রূপকথার মতো। ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপে তরুণ এমবাপ্পে পুরো বিশ্বকে চমকে দেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল সব মিলিয়ে ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। সেই আসরে জেতেন সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
চার বছর পর ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে তিনি যেন আরও ভয়ংকর। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল করে জেতেন গোল্ডেন বুট।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় ফ্রান্সের। তবু সেই রাতেই এমবাপ্পে বুঝিয়ে দেন তিনি বড় মঞ্চের খেলোয়াড়।
গতি, ড্রিবলিং আর ভয়ংকর ফিনিশিং
এমবাপ্পের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিস্ফোরক গতি। ২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এক দৌড়ে ঘণ্টায় ৩৭ কিলোমিটার গতিতে ছুটেছিলেন তিনি। এরপর থেকেই ফ্রান্স দলের ভেতরে তার ডাকনাম হয়ে যায় ‘৩৭’।
তবে শুধু গতি নয়, তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, ড্রিবলিং, ফিনিশিং আর বড় ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তাও তাকে আলাদা করে।
অনেক কিংবদন্তিই ইতোমধ্যে তাকে ভবিষ্যতের সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
পেলে বলেছিলেন, “এমবাপ্পে আমার উত্তরসূরি হতে পারে।”
জিনেদিন জিদানের ভাষায়, “সে ইতিহাস গড়বে এবং সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।”
মাঠের বাইরের এমবাপ্পে
ফুটবলের বাইরেও এমবাপ্পে বেশ প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলারদের একজন।
দাতব্য কাজেও নিয়মিত যুক্ত তিনি। আফ্রিকায় ক্রীড়া উন্নয়ন, বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে নিজেকে শুধু ফুটবলার নয়, একজন দায়িত্বশীল তারকা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
২০২৪ সালে স্টাড মালহার্ব কেইনের মালিকানার বড় অংশ কিনে তিনি নতুন পরিচয়ও পেয়েছেন ক্লাব মালিক হিসেবে।
২০২৬: নতুন ইতিহাসের অপেক্ষা
এখন সামনে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের বর্তমান দলটাকে ইতোমধ্যেই টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ধরা হচ্ছে। এমবাপ্পের সঙ্গে আছেন ওসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিস, রায়ান চেরকি, ডেসিরে দুয়েদের মতো প্রতিভাবান ফুটবলার।
রক্ষণে উইলিয়াম সালিবা ও দায়োত উপামেকানো. মাঝমাঠে আদ্রিয়েন র্যাবিওটরা আছেন। আর সবচেয়ে বড় বিষয়, এটি হতে যাচ্ছে কোচ দিদিয়ের দেশমের শেষ বিশ্বকাপ।
তাই ফ্রান্স চাইবে বিদায়ী উপহার হিসেবে আরও একটি ফাইনাল, হয়তো আরেকটি বিশ্বকাপও।
আর এমবাপ্পে?
তিনি হয়তো তাকিয়ে আছেন আরও বড় ইতিহাসের দিকে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পথে, কিংবা টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার বিরল কীর্তির দিকে।
বন্ডির সেই ছেলেটি এখন শুধু ফরাসি ফুটবলের নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশার নাম।


