Mohamed Salah

মোহাম্মদ সালাহ

রাইট উইঙ্গার
  • জাতীয়তা: মিশর
  • মোট গোল:
  • মোট অ্যাসিস্ট:
  • মোট দলভুক্ত:
  • মোট খেলা:
  • বয়স: ৩৪
  • উচ্চতা: ১৭৫ মিটার
  • ওজন: ৭৫ কেজি
  • পা: বাম পা
  • হলুদ কার্ড:
  • লাল কার্ড:

রাইট উইঙ্গার

মোহাম্মদ সালাহ: নীল নদের তীর থেকে ফুটবল বিশ্বের ‘মিশরীয় রাজা’

মিশরের ছোট্ট গ্রাম নাগরিগ থেকে শুরু। তারপর সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও ইতালির ফুটবল পেরিয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের আসনে বসা। মোহাম্মদ সালাহর গল্পটা যেন অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনুপ্রেরণার গল্প।

৩৪ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বের অন্যতম ধারাবাহিক আক্রমণভাগের ফুটবলার। গতি, ড্রিবলিং, গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচে জ্বলে ওঠার দক্ষতা তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা উইঙ্গারে পরিণত করেছে। কোটি ভক্তের কাছে তিনি পরিচিত এক নামেই—‘মিশরীয় রাজা’।

নাগরিগের সেই স্বপ্নবাজ ছেলেটি

১৯৯২ সালের ১৫ জুন মিশরের গার্বিয়া গভর্নরেটের বাসিউন জেলার নাগরিগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ সালাহ। সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা সালাহর শৈশব মোটেও সহজ ছিল না।

ফুটবল অনুশীলনের জন্য তাকে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হতো। কখনও বাস বদলাতে হয়েছে, কখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে শুধু স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু কষ্ট তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই তার লক্ষ্য ছিল একদিন ইউরোপের বড় মঞ্চে খেলা। সেই স্বপ্নই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় ধাপে ধাপে।

মিশর থেকে ইউরোপের পথে

কায়রোভিত্তিক ক্লাব এল মোকাওলুনের যুব একাডেমিতে ফুটবল শিক্ষা নেন সালাহ। সেখান থেকেই পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার।

২০১২ সালে মিশরের লিগ স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর নতুন সুযোগের সন্ধানে পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে। যোগ দেন এফসি বাজেলে। বাজেলের জার্সিতে খুব দ্রুতই নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন তিনি। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় বড় দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স নজর কাড়ে অনেকের।

ব্যর্থতা পেরিয়ে নতুন উত্থান

২০১৪ সালে ইংলিশ জায়ান্ট চেলসিতে যোগ দেন সালাহ। কিন্তু প্রত্যাশামতো সুযোগ পাননি সেখানে। অনেকের কাছেই তখন মনে হয়েছিল, হয়তো ইউরোপের বড় মঞ্চে তার গল্প এখানেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সালাহ হার মানার মানুষ ছিলেন না।

ধারে ইতালির ফিওরেন্টিনায় গিয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। এরপর রোমার জার্সিতে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেন এবং সিরি আ-এর অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত হন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়।

লিভারপুলে ইতিহাস লেখা

২০১৭ সালে লিভারপুল তাকে দলে ভেড়ায়। অনেকেই ট্রান্সফারটি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু প্রথম মৌসুমেই সব সমালোচনার জবাব দেন সালাহ।২০১৭-১৮ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করেন ৪৪ গোল। প্রিমিয়ার লিগে ৩২ গোল করে ৩৮ ম্যাচের মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। লিভারপুলের হয়ে তিনি জিতেছেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, লিগ কাপ, উয়েফা সুপার কাপ এবং ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি লিভারপুল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতায় পরিণত হন। অ্যানফিল্ডে তার নাম উচ্চারিত হয় ক্লাব কিংবদন্তিদের কাতারে।

পুরস্কার আর রেকর্ডের ঝুলি

সালাহর ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাও ঈর্ষণীয়। তিনি একাধিকবার প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট জিতেছেন। পিএফএ প্লেয়ার্স প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতেছেন একাধিকবার। এছাড়া ফুটবল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মিশরের মানুষের আশার প্রতীক

২০১১ সালে মিশর জাতীয় দলে অভিষেক হয় সালাহর। ২০১৭ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে দলকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। তবে তার সবচেয়ে স্মরণীয় অর্জন আসে একই বছরের অক্টোবরে।

কঙ্গোর বিপক্ষে নাটকীয় ম্যাচে জোড়া গোল করে দীর্ঘ ২৮ বছর পর মিশরকে বিশ্বকাপের মূলপর্বে তোলেন সালাহ। ১৯৯০ সালের পর ২০১৮ বিশ্বকাপে ফেরার সেই আনন্দে পুরো মিশর উল্লাসে ভেসে যায়। জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতাও হয়ে ওঠেন।

মাঠের বাইরের সালাহ

ফুটবলের বাইরেও সালাহ অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিত্ব। নিজের জন্মস্থান নাগরিগে স্কুল, হাসপাতাল ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন তিনি। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার কারণে মিশরে তিনি শুধু ক্রীড়াতারকা নন, একজন জাতীয় নায়ক হিসেবেও বিবেচিত হন। বিনয়ী স্বভাব ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব তাকে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের কাছে আরও প্রিয় করে তুলেছে।

একজন ফুটবলারের চেয়েও বেশি কিছু

মোহাম্মদ সালাহ শুধু গোল করেন না, তিনি স্বপ্ন দেখান। আরব বিশ্ব ও আফ্রিকার লাখো তরুণ তার গল্পে খুঁজে পায় অনুপ্রেরণা যে স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়, ব্যর্থতার পরও উঠে দাঁড়াতে হয়, আর পরিশ্রমের বিকল্প নেই।

নাগরিগের সেই ছেলেটি আজ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। ‘মিশরীয় রাজা’ হিসেবে তিনি হয়তো আরও অনেক রেকর্ড গড়বেন, কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অর্জন থাকবে মানুষকে বিশ্বাস করানো ছোট্ট কোনো গ্রাম থেকেও বিশ্ব জয় করা যায়।