
রিয়াদ মাহরেজ
রাইট উইঙ্গার ৭- জাতীয়তা: আলজেরিয়া
- মোট গোল: ১
- মোট অ্যাসিস্ট: ০
- মোট দলভুক্ত: ০
- মোট খেলা: ১
- বয়স: ৩৫
- উচ্চতা: ৪০৫ মিটার
- ওজন: ৭৬ কেজি
- পা: বাম পা
- হলুদ কার্ড: ০
- লাল কার্ড: ০
রাইট উইঙ্গার
রিয়াদ মাহরেজ: আলজেরিয়া ফুটবলের এক জাদুকরী অধ্যায়
আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে আফ্রিকা থেকে উঠে আসা সবচেয়ে প্রতিভাবান ও সফল খেলোয়াড়দের মধ্যে রিয়াদ মাহরেজ অন্যতম। অসাধারণ ড্রিবলিং, ক্ষিপ্র গতি, নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ এবং বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব ফুটবলে নিজের একটি বিশেষ পরিচয় গড়ে তুলেছেন। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করলেও আলজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে তিনি দেশটির ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা অর্জন করেছেন। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক—উভয় পর্যায়েই তার অর্জন তাকে আধুনিক যুগের অন্যতম সফল আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯৯১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের সারসেলস শহরে জন্মগ্রহণ করেন রিয়াদ করিম মাহরেজ। তার বাবা ছিলেন আলজেরিয়ান এবং মা মরক্কান বংশোদ্ভূত। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। ফ্রান্সের বিভিন্ন যুব দলে খেলতে খেলতে তিনি ধীরে ধীরে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন। তবে শারীরিক গঠনের কারণে অনেক সময় তাকে অবমূল্যায়নের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি সব বাধা অতিক্রম করে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম তারকায় পরিণত হন।
পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু হয় ফরাসি ক্লাব লে হাভরের হয়ে। সেখানে কয়েক বছর খেলেই তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন। ২০১৪ সালে মাত্র পাঁচ লাখ ইউরোর বিনিময়ে ইংলিশ ক্লাব লেস্টার সিটিতে যোগ দেন। সে সময় খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে এই ট্রান্সফার একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেস্টার সিটির হয়ে মাহরেজের উত্থান ছিল রূপকথার মতো। ২০১৫-১৬ মৌসুমে ক্লাউদিও রনিয়েরির অধীনে লেস্টার সিটি পুরো ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জয় করে। সেই ঐতিহাসিক অভিযানে মাহরেজ ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান নায়ক। পুরো মৌসুমজুড়ে তার গোল, অ্যাসিস্ট এবং অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্য লেস্টারের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পিএফএ বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন এবং এই সম্মান অর্জনকারী প্রথম আলজেরিয়ান ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান।
লেস্টারে সফল চারটি মৌসুম কাটানোর পর ২০১৮ সালে তিনি ইংলিশ চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন। সে সময় তার ট্রান্সফার ফি ছিল ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম বড় বিনিয়োগ। বিশ্বখ্যাত কোচ পেপ গার্দিওলার অধীনে মাহরেজ নিজের খেলাকে আরও উন্নত করেন এবং ইউরোপের অন্যতম সফল ক্লাব দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হন।
ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে মাহরেজ একের পর এক শিরোপা জয় করেন। তার সময়ে ক্লাবটি একাধিকবার প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ এবং লিগ কাপ জয় করে। বিশেষ করে বড় ম্যাচগুলোতে তার গোল ও অ্যাসিস্ট দলকে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এনে দেয়। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ের কার্লিং শট নেওয়া ছিল তার অন্যতম ট্রেডমার্ক, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতো।
২০২২-২৩ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অভিযানের অন্যতম অংশ ছিলেন মাহরেজ। ওই মৌসুমে ক্লাবটি প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ঐতিহাসিক ট্রেবল অর্জন করে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও এফএ কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে তার অবদান সমর্থক এবং বিশ্লেষকদের প্রশংসা কুড়ায়। ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণ করে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম সফল উইঙ্গার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
দীর্ঘ সাফল্যময় ইউরোপীয় অধ্যায় শেষে ২০২৩ সালে মাহরেজ সৌদি আরবের ক্লাব আল-আহলিতে যোগ দেন। সৌদি প্রো লিগে যোগ দিয়ে তিনি নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবলে নিজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগাতে শুরু করেন। তার আগমন সৌদি ফুটবলের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক আকর্ষণের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক ফুটবলেও মাহরেজ আলজেরিয়ার অন্যতম সেরা তারকা। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করলেও পারিবারিক শিকড়ের কারণে তিনি আলজেরিয়া জাতীয় দলকে বেছে নেন। ২০১৪ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের পর দ্রুতই তিনি দলের আক্রমণভাগের প্রধান ভরসায় পরিণত হন। তার নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য আলজেরিয়াকে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত করতে সহায়তা করে।
২০১৯ সালে মিশরে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে মাহরেজের নেতৃত্বে আলজেরিয়া মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন এবং দলকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপা এনে দেন। সেমিফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে তার করা দুর্দান্ত ফ্রি-কিক গোলটি এখনও আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্যক্তিগত অর্জনের ক্ষেত্রেও মাহরেজ সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের অধিকারী। ২০১৬ সালে তিনি আফ্রিকার বর্ষসেরা ফুটবলারের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জয় করেন। এছাড়া ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল আফ্রিকান ফুটবলারদের একজন হিসেবেও তিনি স্বীকৃত। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার ধারাবাহিক সাফল্য তাকে আলজেরিয়ান ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
রিয়াদ মাহরেজের ক্যারিয়ার শুধু সাফল্যের গল্প নয়, বরং সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস এবং অধ্যবসায়েরও এক অনন্য উদাহরণ। ফ্রান্সের একটি সাধারণ শহর থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করা এই তারকা আজ কোটি কোটি তরুণ ফুটবলারের অনুপ্রেরণার উৎস। তার জাদুকরী পায়ের ছোঁয়া এবং অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তা তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় উইঙ্গার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে দিয়েছে।


