হাইতি
গ্রুপ সি
রাঙ্কিং: ৮৩
অংশগ্রহণ: ১
দলের পরিচিতি
১১ জুন শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো তিন দেশে আয়োজিত এই আসরে প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। সেই ঐতিহাসিক আসরের একটি নাম এখন ফুটবল বিশ্বের আলোচনায় হাইতি। যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার ছায়া ঠেলে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা ক্যারিবীয় এই দলটি যেন এক জীবন্ত রূপকথা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান
নিকারাগুয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে হাইতি। শুধু একটি ম্যাচ জয় নয়, এটি ছিল এক বিপর্যস্ত জাতির আশা ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত। রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সে যখন সহিংসতা, গ্যাং দখল আর বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকার তখনই এই জয় দেশজুড়ে এনে দেয় অদ্ভুত এক উল্লাস।
৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরার এই অর্জন তাই কেবল ক্রীড়া সাফল্য নয়, বরং হাইতির সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও এক বিরল স্বস্তির বার্তা।
মাঠের বাইরে যুদ্ধ, মাঠের ভেতরে প্রতিরোধ
হাইতির বর্তমান বাস্তবতা ফুটবলের জন্যও সহজ নয়। নিরাপত্তা সংকটের কারণে দলটির কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে কখনোই দেশটির মাটিতে পা রাখতে পারেননি। পুরো প্রস্তুতি হয়েছে বিদেশে বসেই। এমনকি হাইতির সব হোম ম্যাচও খেলতে হয়েছে নিরপেক্ষ ভেন্যু কুরাসাওয়ে।
তবু প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি দলটিকে। কনক্যাকাফ অঞ্চলের শক্ত প্রতিপক্ষ হন্ডুরাস ও কোস্টারিকাকে পেছনে ফেলে গ্রুপসেরা হয়েই বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে তারা।
নতুন শক্তির জন্ম
হাইতির ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এটি গত দুই দশকের সেরা দল। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলা প্রবাসী ফুটবলারদের সঙ্গে স্থানীয় খেলোয়াড়দের মিশেলে তৈরি হয়েছে এক ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড।
উলভারহ্যাম্পটনের জাঁ-রিকার বেলগার্ড, বার্নলির হানেস দেলক্রো এবং এজে অসেরের জসু কাসিমিরদের মতো ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা যেমন আছে, তেমনি আছেন স্থানীয় লড়াকু ফুটবলার ডানলি জিন জেকস, রিকাদো আদে ও দন দিদসনরা। এই মিশ্রণই হাইতিকে দিয়েছে নতুন শক্তি ও আত্মবিশ্বাস।
ফুটবল এখন শান্তির বার্তা
দেশটির ফুটবলাররা এখন কেবল খেলোয়াড় নন, অনেকের কাছে তারা শান্তির প্রতীক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারিত হ্যাশট্যাগ ‘#ouvèpeyia’ (দেশকে উন্মুক্ত করো) এখন আলোচনায়।
দ্রগবার ২০০৬ সালের আইভরি কোস্টের গৃহযুদ্ধ থামানোর ঐতিহাসিক বার্তার মতোই হাইতির ফুটবলাররাও চান, দেশে শান্তি ফিরে আসুক। তারা চান, বিশ্বকাপের আনন্দ যেন নিজ দেশে নিরাপদে পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।
দারিদ্র্য ও সংগ্রামের দেশ
হাইতিতে অর্ধেকের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে। এমন বাস্তবতায় ফুটবলই এখন অনেকের কাছে একমাত্র আশ্রয় ও ঐক্যের প্রতীক।
১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত প্রজাতন্ত্র হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল হাইতি। একই ঐতিহাসিক তারিখেই ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়া যেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি।
কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে: নীরব স্থপতি
হাইতির এই সাফল্যের পেছনে অন্যতম কারিগর ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে। ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দলটিকে বিশ্বকাপ পর্যন্ত নিয়ে আসেন।
ইংল্যান্ডের নিচু স্তরের লিগে খেলোয়াড় জীবন শুরু করা মিগনে খুব অল্প বয়সেই কোচিংয়ে আসেন। জঁ-পিয়ের পাপাঁর সহকারী হিসেবে কাজ করার পর তিনি কাজ করেছেন ওমান, কঙ্গো ও কেনিয়ার মতো দেশে। ২০১৯ সালে তাঁর অধীনেই কেনিয়া ১৫ বছর পর আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে খেলার সুযোগ পায়।
তারকা: ডাকেন্স নাজোঁ
হাইতির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা ডাকেন্স নাজোঁ এখন দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। বাছাইপর্বে কোস্টারিকার বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পথ খুলে দেয়।
ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, সন্তানের জন্ম উপেক্ষা করে খেলার মাঠে থাকা এই স্ট্রাইকারকে অনেকেই হাইতির প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন। বর্তমানে তিনি ইরাকি ক্লাব এস্তেঘলালে খেলছেন।
বিশ্বকাপ গ্রুপপর্বে হাইতি
জুন ১৪: স্কটল্যান্ড-বোস্টন (সকাল ৭টা)
জুন ২০: ব্রাজিল-ফিলাডেলফিয়া (সকাল ৭টা)
জুন ২৫: মরক্কো-আটলান্টা (ভোর ৪টা)
বিশ্বকাপ ইতিহাস
হাইতির এটি মাত্র তৃতীয় বিশ্বকাপ।
সর্বোচ্চ সাফল্য: ১৯৭৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব।


