ইরাক
গ্রুপ আই
রাঙ্কিং: ৫৭
অংশগ্রহণ: ১
দলের পরিচিতি
৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান। মেক্সিকোর মন্টেরে শহরের এস্তাদিও বিবিভিএ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে ইরাক। সাড়ে চার কোটির বেশি মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা তখন রূপ নেয় উচ্ছ্বাসে, আবেগে আর ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়ে।
‘মেসোপটেমিয়ান সিংহ’দের এই প্রত্যাবর্তন এসেছে কঠিন পথ পেরিয়ে। মার্চে আন্তর্মহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়া-কে ২–১ গোলে হারিয়ে তারা শেষ করে ২১ ম্যাচের লড়াই। এই জয়ই ইরাককে পৌঁছে দেয় ১৯৮৬ সালের পর তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে।
৪০ বছরের ব্যবধান, দুই প্রজন্মের গল্প
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর ২০২৬ সালের এই আসরই ইরাকের দ্বিতীয় বিশ্বমঞ্চ। দীর্ঘ এই সময়ে যুদ্ধ, অস্থিরতা আর বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় বারবার থেমে গেছে তাদের ফুটবলের পথচলা। তবু সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে এবার তারা ফিরছে নতুন প্রজন্ম নিয়ে।
সেই পুরোনো দলেরই একজন পরিচিত মুখ সামির শাকির মাহমুদ। আশির দশকের ইরাক দলের এই ডিফেন্ডার ১৯৮৭ সালে ঢাকার আবাহনী লিমিটেড-এ যোগ দিয়ে বাংলাদেশ ফুটবলে নিজের ছাপ রাখেন। পরবর্তীতে কোচ হিসেবে ১৯৯৯ এসএ গেমসে বাংলাদেশকে সোনা এনে দেওয়ার ঘটনাও জড়িয়ে আছে তাঁর নামের সঙ্গে। চার দশক পর সেই ইরাক আবার বিশ্বমঞ্চে।
নতুন প্রজন্মের প্রতীক আয়মেন হুসেন
এই যাত্রার সবচেয়ে বড় মুখ আয়মেন হুসেন। বলিভিয়ার বিপক্ষে তাঁর গোল শুধু জয় এনে দেয়নি, হয়ে উঠেছে এক জাতির সংগ্রামের প্রতীক।
২০০৮ সালে আল-কায়েদার হামলায় বাবাকে হারান তিনি। ২০১৪ সালে নিখোঁজ হন ভাই। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে শক্তিতে রূপ দিয়ে তিনি এখন ইরাকের জাতীয় নায়ক। জাতীয় দলের হয়ে ৯৩ ম্যাচে ৩৩ গোল করা এই স্ট্রাইকারের কণ্ঠেই ধরা পড়ে বাস্তবতার কঠিন বোধ হারানো কিছু আর ফিরে পাওয়া যাবে না, তবে এগিয়ে যাওয়া থেমে থাকে না।
আরেক যোদ্ধা আলি আল-হামাদি
এই দলে আছেন আলি আল-হামাদি। শৈশবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে ফিরিয়েছেন নিজের শিকড়ের গল্প।
কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডের নেতৃত্ব
ইরাকের এই পুনর্জাগরণের পেছনে বড় ভূমিকা কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড-এর। ২০২৫ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সময়ের বড় অংশ কাটিয়েছেন ইরাক-এ, খেলোয়াড়দের সংস্কৃতি ও মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করেছেন।
তার বিশ্বাস ছিল, এই লড়াই শুধু ১১ জন খেলোয়াড়ের নয় এটি একটি ইতিহাসবিধ্বস্ত জাতির আত্মপরিচয়ের লড়াই।
ইউরোপে বেড়ে ওঠা নতুন শক্তি
ইরাক দলে আছেন তরুণ প্রতিভা জিদান ইকবাল ও আলী জাসিম। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে অভিজ্ঞ এই প্রজন্ম এবার বিশ্বকাপে যাচ্ছে কেবল অংশ নিতে নয়, বরং নতুন ইতিহাস লিখতে।
কঠিন গ্রুপে ইরাক
২০২৬ বিশ্বকাপে ইরাককে পড়তে হয়েছে কঠিন গ্রুপে। তাদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ে।
ম্যাচ সূচি
ইরাক তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে-
* ১৭ জুন বনাম নরওয়ে, বোস্টন (ভোর ৪টা)
* ২২ জুন বনাম ফ্রান্স, ফিলাডেলফিয়া (রাত ৩টা)
* ২৬ জুন বনাম সেনেগাল, টরন্টো (রাত ১টা)
ইতিহাসের পরিসংখ্যান
এশিয়া অঞ্চলের ইরাক বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৫৭ নম্বরে রয়েছে। বিশ্বকাপে এটি তাদের দ্বিতীয় অংশগ্রহণ। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার খেললেও সেবার তারা গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি।
চার দশকের ব্যবধান পেরিয়ে আবার বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরাকের এই দল এখন শুধু একটি ফুটবল দল নয়-এটি এক জাতির টিকে থাকা, ঘুরে দাঁড়ানো আর নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রতীক।


