জর্ডান
গ্রুপ জে
রাঙ্কিং: ৬৩
অংশগ্রহণ: ০
দলের পরিচিতি
দীর্ঘ প্রতীক্ষা, একের পর এক ব্যর্থতা আর অপূর্ণ স্বপ্নের অধ্যায়ের পর অবশেষে বিশ্বকাপের মঞ্চে উঠছে জর্ডান। নয়বার চেষ্টা করেও যে স্বপ্ন অধরা ছিল, সেটিই এবার বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ প্রথমবারের মতো জায়গা নিশ্চিত করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি।
শুধু বিশ্বকাপে ওঠাই নয়, জর্ডানের ফুটবল এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা দেশটির ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এএফসি এশিয়ান কাপের ফাইনালে পৌঁছানোর পর বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দলটি প্রমাণ করেছে এটি আর কেবল সম্ভাবনার গল্প নয়, বরং বাস্তব শক্তিতে পরিণত হওয়া একটি দলের উত্থান।
সাফল্যের ভিত গড়ে দেয়া কোচ জামাল সেলামি
এএফসি এশিয়ান কাপ এবং বিশ্বকাপ বাছাইয়ের দ্বিতীয় পর্বে সাফল্যের পর সাবেক কোচ হুসেইন আম্মুতা নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে দল ছাড়েন। এরপর জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এমন একজন কোচের খোঁজ শুরু করে, যিনি দলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত তারা আম্মুতার স্বদেশি মরক্কোর জামাল সেলামিকে দায়িত্ব দেয়। তিনি আগের সাফল্যের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে দলকে আরও এগিয়ে নিয়েছেন।
৫৫ বছর বয়সী সেলামি খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন একজন অসাধারণ মিডফিল্ডার। তিনি রাজা কাসাব্লাঙ্কার হয়ে বহু শিরোপা জিতেছেন এবং তুরস্কের ক্লাব বেসিকতাসে তিন বছরের সফল সময় কাটিয়েছেন। এছাড়া তিনি মরক্কো জাতীয় দলের হয়ে ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপে খেলেছিলেন। ২০০৪ সালে মাগরেব ফেজে খেলাকালীন তিনি অবসর নেন।
অবসরের পর তিনি কোচিংয়ে যুক্ত হন এবং রাজা কাসাব্লাঙ্কার যুব দলসহ বিভিন্ন ক্লাবে কাজ করেন। পরে সিনিয়র পর্যায়ে দায়িত্ব নেন। এফইউএস রাবাতের দায়িত্ব পালনের পর তিনি ২০১৯-২০ মৌসুমে রাজা কাসাব্লাঙ্কাকে লিগ শিরোপা জেতান। এছাড়া ২০১৮ আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপেও মরক্কোকে শিরোপা এনে দেন।
২০২৪ সালের জুনে জর্ডানের দায়িত্ব নেয়ার পর সেলামি দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা বজায় রাখার পাশাপাশি নমনীয় ও সমন্বিত আক্রমণভিত্তিক খেলার ধারা গড়ে তুলেছেন। তার অধীনে এখন পর্যন্ত ১২ ম্যাচে জর্ডান হেরেছে মাত্র দুটি দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরাকের বিপক্ষে। এ সময়ে দলটি ১৯ গোল করেছে এবং হজম করেছে ৮টি।
জর্ডানের সবচেয়ে বড় ভরসা মুসা আল-তামারি
বর্তমান জর্ডান দলের সবচেয়ে বড় তারকা নিঃসন্দেহে মুসা আল-তামারি। ক্যারিয়ারের শুরুতে ‘জর্ডানের মেসি’ নামে পরিচিতি পেলেও এখন তিনি নিজের নামেই আলো ছড়াচ্ছেন।
২৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের গতি, ড্রিবলিং ও বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশিং জর্ডানের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র। উইং থেকে দ্রুত বক্সে ঢুকে পড়ার দক্ষতায় প্রতিপক্ষ রক্ষণকে প্রায়ই বিপাকে ফেলেন তিনি। বর্তমানে ফ্রান্সের ক্লাব রেনে-তে খেলা এই ফরোয়ার্ড চলতি মৌসুমেও আছেন দুর্দান্ত ফর্মে।
বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হওয়ার আগে জর্ডানি সমর্থকদের সবচেয়ে বড় আশা এখন আল-তামারিকেই ঘিরে।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ জর্ডানের সূচি ও গ্রুপ
| তারিখ | প্রতিপক্ষ | ভেন্যু | সময় (বাংলাদেশ অনুযায়ী) |
| ১৭ জুন | অস্ট্রিয়া | সান ফ্রান্সিসকো | সকাল ১০টা |
| ২৩ জুন | আলজেরিয়া | সান ফ্রান্সিসকো | সকাল ৯টা |
| ২৮ জুন | আর্জেন্টিনা | ডালাস | সকাল ৮টা |
যেভাবে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে জর্ডান
জর্ডানের বিশ্বকাপ বাছাই অভিযান শুরু হয় এএফসি বাছাইয়ের দ্বিতীয় পর্ব থেকে। শুরুটা ছিল কঠিন-তাজিকিস্তানের মাঠে ড্র এবং ঘরের মাঠে সৌদি আরবের কাছে হার। তবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা টানা চার ম্যাচ জেতে, যার মধ্যে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৭-০ গোলের বিশাল জয়ও ছিল। ফলে গোল ব্যবধানে সৌদি আরবকে পেছনে ফেলে তারা এগিয়ে যায়।
তৃতীয় পর্বে সেলামির অধীনে দলটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আক্রমণভাগে মুসা আল-তামারি, ইয়াজান আল-নাইমাত ও আলি আলওয়ানের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ২০২৫ সালের ৫ জুন ওমানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তারা ১৬ পয়েন্টে পৌঁছে যায়। পরে একই দিনে ইরাক দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হারলে জর্ডানের সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয়।
জর্ডানের বিশ্বকাপ ইতিহাস
* র্যাঙ্কিং: ৬৩
* কনফেডারেশন: এএফসি
* বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ২০২৬ (প্রথমবার)
হতাশা পেরিয়ে জর্ডানের বিশ্বকাপ স্বপ্নপূরণ
এর আগে প্রতিটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে হতাশা সঙ্গী হলেও কিছু স্মরণীয় অধ্যায় ছিল। বিশেষ করে ব্রাজিল ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তারা উজবেকিস্তানের সঙ্গে দুই লেগ মিলিয়ে ২-২ ড্র করার পর টাইব্রেকারে জিতে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে ওঠে।
বিশ্বকাপে ওঠার স্বপ্ন তখন মাত্র ১৮০ মিনিট দূরে। কিন্তু প্রতিপক্ষ ছিল ২০১০ বিশ্বকাপে চতুর্থ হওয়া শক্তিশালী উরুগুয়ে, যাদের দলে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ, এডিনসন কাভানি ও দিয়েগো ফোরলানের মতো তারকা। প্রথম লেগে আম্মানে বড় ব্যবধানে জিতে যায় উরুগুয়ে। দ্বিতীয় লেগে মন্টেভিডিওতে জর্ডান সম্মানজনক ড্র করলেও বিশ্বকাপের টিকিট অধরাই থেকে যায়।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে জর্ডানের সর্বোচ্চ গোলদাতা
আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হয়েও হাসান আবদেল-ফাত্তাহ ছিলেন দুর্দান্ত গোলস্কোরার। দূরপাল্লার শক্তিশালী শট এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ১১ বছরের ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গোল জর্ডান ফুটবলের ইতিহাসে তাকে বিশেষ জায়গা এনে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তার ১৬ গোল এখনো জর্ডানের সর্বোচ্চ। ২০০৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল দিয়ে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা, আর শেষ হয় রাশিয়া ২০১৮ বাছাইয়ে তাজিকিস্তানের বিপক্ষে গোলের মাধ্যমে। ব্রাজিল ২০১৪ বাছাইয়ের প্রথম রাউন্ডে নেপালের বিপক্ষে জর্ডানের ৯-০ গোলের জয়ে তিনি একাই করেছিলেন চার গোল।


