চেকোস্লোভাকিয়া
গ্রুপ এ
রাঙ্কিং: ৪১
অংশগ্রহণ: ১
দলের পরিচিতি
দুই দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। ইউরোপীয় প্লে-অফে টানা দুই ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটের উত্তেজনাপূর্ণ জয় পেয়ে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে চেকোস্লোভাকিয়া। রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্ককে হারিয়ে নাটকীয় এই পথ পেরিয়ে আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরছে মধ্য ইউরোপের দলটি।
প্লে-অফে নাটকীয় উত্তরণ
প্লে-অফের সেমিফাইনালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রাগে শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে কার্যত বিদায়ের শঙ্কায় পড়েছিল চেকরা। তবে পেনাল্টি থেকে প্যাট্রিক শিক এবং অধিনায়ক লাদিস্লাভ ক্রেইচির গোলে ম্যাচে ফেরে তারা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করে চেকোস্লোভাকিয়া।
ফাইনালে প্রতিপক্ষ ডেনমার্ক। এবারও নাটক কমেনি। ২-২ গোলে ১২০ মিনিট শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ড্যানিশদের চারটি শটের মধ্যে তিনটি ঠেকিয়ে দেন চেক গোলরক্ষক। শেষ পর্যন্ত মিখাল সাদিলেকের সফল শটে উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো দল।
ঠান্ডা আবহাওয়ার প্রাগের ইপেট এরিনায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও হাজারো দর্শক উন্মাতাল উদযাপনে মেতে ওঠে। ম্যাচ শেষে ফ্লেয়ারের আলোয় লাল হয়ে ওঠে প্রাগের আকাশ।
কৌবেকের নেতৃত্বে ব্যর্থতা থেকে ফিরে আসা
বাছাইপর্বে গ্রুপ ‘এল’-এ ক্রোয়েশিয়ার পেছনে থেকে দ্বিতীয় হওয়ার পরই প্লে-অফে যায় চেকরা। তবে পথটা সহজ ছিল না। ফ্যারো আইল্যান্ডের কাছে ২-১ ব্যবধানে অপ্রত্যাশিত হার দলের কোচিং স্টাফে পরিবর্তন আনে। এরপর দায়িত্ব নেন অভিজ্ঞ কোচ মিরোস্লাভ কৌবেক।
৭৪ বছর বয়সী এই কোচ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নিয়ে দলের মানসিকতা বদলে দেন। তার অধীনে প্লে-অফে টানা দুই কঠিন ম্যাচে জয় পায় দল। খেলোয়াড় হিসেবে স্পার্টা প্রাগের সাবেক গোলরক্ষক কৌবেক ১৯৮০-এর দশক থেকে কোচিং শুরু করেন। ভিক্টোরিয়া প্লজেনের কোচ হিসেবেও সফল সময় কাটিয়েছেন তিনি। এই বিশ্বকাপই হতে পারে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন।
সবচেয়ে বড় ভরসা প্যাট্রিক শিক
আধুনিক চেক দলের সবচেয়ে বড় ভরসা প্যাট্রিক শিক। ২০২০ ইউরোতে মাঝমাঠ থেকে করা অবিশ্বাস্য গোলের পর থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক আলোচনায়। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্লে-অফে পিছিয়ে পড়া অবস্থায় পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে ফেরান তিনি।
বায়ার লেভারকুসেনের এই ফরোয়ার্ডের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন লুকাস প্রোভোদ, টমাস চুরি ও তরুণ ডিফেন্ডার লাদিস্লাভ ক্রেইচি। ইংলিশ ক্লাব উলভসের হয়ে খেলা ক্রেইচি অধিনায়ক হিসেবে রক্ষণভাগ সামলাচ্ছেন। তবে এই দলটি অতীতের নেদভেদ-চেক যুগের মতো তারকাসমৃদ্ধ নয়। বরং ‘সাধারণ’ খেলোয়াড়দের সমন্বিত লড়াইয়েই এসেছে বড় সাফল্য।
বিশ্বকাপে ফিরছে ২০ বছরের পর
চেকোস্লোভাকিয়া সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলেছিল ২০০৬ সালে জার্মানিতে। তখন টমাস রোসিতস্কির দুই গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে ৩-০ ব্যবধানে হারালেও পরে ঘানা ও ইতালির কাছে হেরে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয় তারা।
এর আগে চেকোস্লোভাকিয়া হিসেবে দলটি দুইবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল ১৯৩৪ ও ১৯৬২ সালে। দুবারই রানার্সআপ হয়ে থেমেছিল তাদের স্বপ্ন।
২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের সূচি
চেকোস্লোভাকিয়া এবার খেলবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের সঙ্গে-
| তারিখ | প্রতিপক্ষ | ভেন্যু | সময় (বাংলাদেশ অনুয়যায়ী) |
| ১১ জুন | কোরিয়া প্রজাতন্ত্র | এস্তাদিও গুদালাহারা | সকাল ৮টা |
| ১৮ জুন | দক্ষিণ আফ্রিকা | আটলান্টা | রাত ১০টা |
| ২৪ জুন | মেক্সিকো | মেক্সিকো সিটি | সকাল ৭টা |
ইতিহাস ও পরিসংখ্যান
* কনফেডারেশন: ইউরোপ
* ফিফা র্যাঙ্কিং: ৪১
* সেরা ফল: রানার্সআপ (১৯৩৪, ১৯৬২)
* শেষ বিশ্বকাপ: জার্মানি ২০০৬ (গ্রুপ পর্ব)
* প্রথম বিশ্বকাপ: ইতালি ১৯৩৪ (রানার্স-আপ)
* মোট অংশগ্রহণ: ১০ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৮২, ১৯৯০, ২০০৬, ২০২৬)
* সামগ্রিক রেকর্ড: ৩৩ ম্যাচ, ১২ জয়, ৫ ড্র, ১৬ হার, গোল ৪৭-৪৯
চেকোস্লোভাকিয়া ১৯৯৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ‘চেকোস্লোভাকিয়া’ নামে এবং ১৯৩০-১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ‘চেকোস্লোভাকিয়া’ হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেয়। ১৯৩৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অভিষেকেই ফাইনালে উঠেছিল দলটি। আর ১৯৬২ সালে চিলিতে ব্রাজিলের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়।
চেকোস্লোভাকিয়ার সেরা বিশ্বকাপ
পূর্ববর্তী রাষ্ট্র চেকোস্লোভাকিয়া হিসেবে তারা ১৯৩৪ এবং ১৯৬২ সালে রানার্সআপ হয়। ১৯৩৪ সালে তারা রোমানিয়া, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে, তবে স্বাগতিক ইতালির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে যায়। ১৯৬২ সালে চিলি বিশ্বকাপে তারা হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে, কিন্তু ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে পরাজিত হয়।
চেকোস্লোভাকিয়ার শেষ বিশ্বকাপ
তাদের শেষ বিশ্বকাপ ছিল ২০০৬ সালে জার্মানিতে। তখন দেশটি চেকোস্লোভাকিয়া নামে খেলেছিল। তারা দুর্দান্তভাবে শুরু করে, যুক্তরাষ্ট্রকে ৩-০ গোলে হারায় (টমাস রোসিতস্কির দুই গোলসহ)। কিন্তু এরপর ঘানা ও ইতালির কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
চেকোস্লোভাকিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ
১৯৩৪ সালে ইতালিতে চেকোস্লোভাকিয়ার বিশ্বকাপ অভিষেক হয়। রোমানিয়া ও সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে তারা সেমিফাইনালে ওঠে, যেখানে ওলদ্রিখ নেজেদলি জার্মানির বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন। ফাইনালে ইতালির কাছে তারা অতিরিক্ত সময়ে হেরে যায়।
চেকোস্লোভাকিয়ার শীর্ষ গোলদাতা
নেজেদলি ১৯৩৪ বিশ্বকাপে ৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। মোট বিশ্বকাপে তার গোল সংখ্যা ৭। এরপর টমাস স্কুহ্রাভির ৫ গোল।
সর্বাধিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
লাদিসলাভ নোভাক তিনটি বিশ্বকাপে ১২টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ১৯৬২ সালের ফাইনালিস্ট দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
স্মরণীয় মুহূর্ত
১৯৩৪ এবং ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ অভিযানে অনেক নাটকীয় মুহূর্ত ছিল। ১৯৬২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ৮০ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচ ১-১ ছিল, পরে অ্যাডলফ শেরারের দুই গোল চেকোস্লোভাকিয়াকে জয় এনে দেয়। ১৯৯০ সালে তারা শেষ ১৬-তে কোস্টারিকাকে হারায়, যেখানে টমাস স্কুহ্রাভি হ্যাটট্রিক করেন।
সবচেয়ে বড় জয়
১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৬-১ গোলের বিশাল জয় পায় চেকোস্লোভাকিয়া। জদেনেক জিকান এবং ভ্যাক্লাভ হোভোরকা দুজনেই দুটি করে গোল করেন।
শেষ কথা
দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে ফেরার এই সুযোগকে ঘিরে চেকিয়ায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। অভিজ্ঞ কোচ, পরীক্ষিত খেলোয়াড় আর নাটকীয় প্লে-অফ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে দলটি এবার উত্তর আমেরিকার মঞ্চে নিজেদের আবারও প্রমাণ করতে চায়।


