ফিফার শেষ তিন সভাপতিরই সঙ্গী বিতর্ক
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫:০৬, ৫ আগস্ট ২০২৬
১৯৭৪ থেকে ২০২৬, এই ৫২ বছরে মাত্র তিনজন সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। ছবি- সংগৃহীত
শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে ফিফা। কিন্তু তাতেও থামেনি বিতর্ক। বরং সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে চারদিকে। যদিও ফিফার ইতিহাস বলছে, ইনফান্তিনোই প্রথম নন; গত পাঁচ দশকে সংস্থাটির নেতৃত্বে থাকা তিন সভাপতির প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় বিতর্ক, তদন্ত কিংবা শাসনসংকটের মুখে পড়েছেন।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ইতিহাসে ১৯৭৪ সালের পর মাত্র তিনজন সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছেন; জোয়াও হাভেলাঞ্জ, সেপ ব্লাটার ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনজনের হাত ধরেই ফিফা আর্থিকভাবে আরও শক্তিশালী ও বৈশ্বিক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেকের মেয়াদকালেই সামনে এসেছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আর্থিক অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার ব্যবহারের মতো নানা বিতর্ক। এ নিয়ে প্রকাশিত ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ও গ্লোবো এর এক বিশ্লেষণে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
তবে অভিযোগের ধরন ও আইনি অবস্থান এক নয়। হাভেলাঞ্জের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগকে ফিফার নৈতিকতা কমিটি গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছিল। ব্লাটার ফিফার অভ্যন্তরীণ শাস্তির মুখে পড়লেও, মিশেল প্লাতিনিকে অর্থ দেয়ার ঘটনায় সুইস আদালতে শেষ পর্যন্ত খালাস পান। অন্যদিকে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে হওয়া একাধিক তদন্তের কোনোটি অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠছে নেতৃত্বের ধরন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ঘিরে।
হাভেলাঞ্জ: বাণিজ্যিক বিপ্লবের নায়ক, বিতর্কেরও কেন্দ্র
১৯৭৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত টানা ২৪ বছর ফিফার নেতৃত্বে ছিলেন ব্রাজিলের জোয়াও হাভেলাঞ্জ। তার সময়েই বিশ্বকাপের পরিসর বাড়ে, স্পনসরশিপ ও সম্প্রচারস্বত্ব থেকে ফিফার আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই বাণিজ্যিক সাফল্যের আড়ালেই তৈরি হয় সংস্থাটির প্রথম বড় দুর্নীতির বিতর্ক।
ফিফার দীর্ঘদিনের বিপণন অংশীদার আইএসএলের কাছ থেকে গোপনে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে হাভেলাঞ্জের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালে ফিফার নৈতিকতা কমিটি তাঁর আচরণকে 'নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য' বলে মন্তব্য করে। বিতর্কের জেরে ফিফার সম্মানসূচক সভাপতির পদও ছেড়ে দেন তিনি।
ব্লাটার: ক্ষমতার শীর্ষ থেকে পতন
হাভেলাঞ্জের উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৯৮ সালে দায়িত্ব নেন সেপ ব্লাটার। তার নেতৃত্বে ফিফার রাজস্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে রাজনৈতিক প্রভাবও। তবে বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচন, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বছরের পর বছর সমালোচনার মুখে ছিলেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তের ভিত্তিতে জুরিখে ফিফার একাধিক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হওয়ার পর সংস্থাটি নজিরবিহীন সংকটে পড়ে। ব্লাটারের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি অভিযোগ না থাকলেও, কেলেঙ্কারির দায় এড়াতে পারেননি তিনি। পুনর্নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
পরে মিশেল প্লাতিনিকে ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ দেয়ার ঘটনায় ফিফা তাকে নিষিদ্ধ করে। যদিও একই ঘটনায় সুইস আদালতে দুই দফায়ই খালাস পান ব্লাটার ও প্লাতিনি।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, নতুন বিতর্ক
ব্লাটার-পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে ফিফার দায়িত্ব নেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় আসেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রশাসনও বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি।
সুইস অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে গোপন বৈঠক, ব্যক্তিগত বিমান ব্যবহারের অভিযোগ কিংবা মানবাধিকার প্রশ্নে সমালোচিত দেশগুলোতে বিশ্বকাপ আয়োজনের সমর্থন; বিভিন্ন কারণে একাধিকবার আলোচনায় এসেছেন ইনফান্তিনো। যদিও এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া তদন্তের কোনোটিই শেষ পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি।
নতুন সংকটের কেন্দ্র বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার
সবশেষ বিতর্কের সূত্রপাত বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা থেকে। সেই প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে বিপুল অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল ফিফার।
ইনফান্তিনোর দাবি ছিল, এই অর্থ সদস্যদেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। কিন্তু উয়েফা, কনকাকাফ এবং বিভিন্ন জাতীয় ফুটবল সংস্থা পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার কড়া সমালোচনা করে। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে বেসরকারি প্রভাব বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।
প্রবল বিরোধিতার মুখে পরিকল্পনা প্রত্যাহার করলেও চাপ কাটেনি। কয়েকটি ফেডারেশন ইতিমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি আগের সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। এমনকি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনাসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণের দাবিও তুলেছে উয়েফা।
মজার বিষয়, ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন তার পূর্বসূরি সেপ ব্লাটারও। তার মতে, বিশ্বকাপ এমন কোনো সম্পদ নয়, যার মালিকানার অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেয়া উচিত।
হাভেলাঞ্জ, ব্লাটার ও ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফা আর্থিকভাবে যতটা শক্তিশালী হয়েছে, ততবারই সংস্থাটি ফিরেছে বিতর্কের শিরোনামে। সর্বশেষ ঘটনাও সেই দীর্ঘ ইতিহাসে যোগ করল নতুন একটি অধ্যায়।



