যুদ্ধের কারণে দেশ ছাড়া আল-হামাদিই ইরাককে বিশ্বকাপে নেয়ার নায়ক
প্রকাশ: ২২:০০, ১২ মে ২০২৬
বিশ্বকাপে পৌছানো ইরাক দল। ছবি: সংগৃহীত
ইরাকের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছেন আলি আল-হামাদি। লুটন টাউনের এই স্ট্রাইকার ক্লাব ফুটবলে চোটে জর্জরিত কঠিন একটি মৌসুম কাটালেও, জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে এখন দেশের নায়ক তিনি।
২৪ বছর বয়সী আল-হামাদি চলতি মৌসুমে ইংল্যান্ডের তৃতীয় স্তরের ফুটবলে মাত্র একটি লিগ গোল করেছেন। ইনজুরির কারণে বেশিরভাগ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাকে। ফলে লুটন টাউনও প্রোমোশন প্লে-অফে উঠতে ব্যর্থ হয়। তবে সব হতাশা ছাপিয়ে তার সামনে এখন রয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ, ফিফা বিশ্বকাপ।
মার্চে বলিভিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে আল-হামাদির গোলেই এগিয়ে যায় ইরাক। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জিতে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’।
বিশ্বকাপে ওঠার পর টকস্পোর্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আবেগাপ্লুত আল-হামাদি বলেন, ‘ইরাকে ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষ, আর প্রত্যেকে সেই ম্যাচ দেখছিল। অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে
আল-হামাদির জীবনের গল্প যেন সিনেমাকেও হার মানায়। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে মাত্র এক বছর বয়সে মা আসিলকে নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। জর্ডান হয়ে তারা আশ্রয় নেন যুক্তরাজ্যে। সেখানে গিয়ে প্রথমবার বাবার সঙ্গে দেখা হয় তার।
তার বাবা ইব্রাহিম আল-হামাদি ছিলেন সাদ্দাম হোসেনের শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের একজন কর্মী। আন্দোলনের কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং লিভারপুলে বসবাস শুরু করেন।
লিভারপুলের দরিদ্র টক্সটেথ এলাকায় বেড়ে ওঠা আল-হামাদির কাছে ফুটবল ছিল বাস্তবতার কষ্ট ভুলে থাকার একমাত্র উপায়। তিনি বলেন, ‘ফুটবলই ছিল এমন একটি জিনিস, যা আমাকে সব সমস্যার কথা ভুলিয়ে দিত।’
ইংলিশ ফুটবলে ইতিহাস
ট্রানমেয়ার রোভার্স ও সোয়ানসির যুব দলে খেলার পর এএফসি উইম্বলডনে নিজের প্রতিভার জানান দেন আল-হামাদি। সেখানে ২৭ গোল করে নজর কাড়েন এবং পরে যোগ দেন ইপসউইচ টাউনে। ইপসউইচের হয়ে মাঠে নেমে তিনি ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে খেলা প্রথম ইরাকি ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
তিনি বলেন, ‘প্রথম ইরাকি হিসেবে খেলতে পারা আমার ও পরিবারের জন্য গর্বের। শুধু আমাদের জন্য নয়, ইরাকের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্যও এটা বড় অনুপ্রেরণা।’
তবে ইপসউইচে খুব বেশি সফল হতে পারেননি তিনি। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের অভাবে প্রথমে স্টোক সিটিতে, পরে লুটন টাউনে ধারে পাঠানো হয় তাকে। ইনজুরির কারণে লুটনের হয়েও পুরো মৌসুমে খেলেছেন মাত্র ১৪ ম্যাচ।
বাবার সঙ্গে আবেগঘন মুহূর্ত
বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আল-হামাদি। দ্য অ্যাথলেটিককে তিনি জানান, মাঠেই বাবাকে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘আমার বাবা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। আর আজ আমি সেই দেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছি, এটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমার পরিবার এবং ইরাকের মানুষ এটা প্রাপ্য।’
কঠিন গ্রুপে ইরাক
২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘আই’-এ পড়েছে ইরাক। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ফ্রান্স, নরওয়ে ও সেনেগাল।
গ্রুপ পর্বে ইরাকের সূচি
১৬ জুন: ইরাক বনাম নরওয়ে; জিলেট স্টেডিয়াম, ফক্সবরো
২২ জুন: ফ্রান্স বনাম ইরাক; লিংকন ফিন্যান্সিয়াল ফিল্ড, ফিলাডেলফিয়া
২৬ জুন: সেনেগাল বনাম ইরাক; বিএমও ফিল্ড, টরন্টো



