Worldcup Countdown

00

DAYS

00

HOURS

00

MINUTES

00

SECONDS

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা: যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে ফের বিশ্বকাপে

জিহাদুল ইসলাম

প্রকাশ: ০০:৫৮, ১ জুন ২০২৬

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা: যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে ফের বিশ্বকাপে

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ফুটবল দলের বিশ্বকাপে পৌঁছানোর উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

মার্চের ৩১ তারিখ রাত; বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ফুটবল ইতিহাসে আরেকটি স্বর্ণালি অধ্যায় রচিত হলো জেনিচার বিলিনো পোলিয়ে স্টেডিয়ামে। বহুদিন ধরেই এই মাঠকে প্রতিপক্ষদের জন্য ‘অভিশপ্ত’ বলে মনে করা হয়। আর সেই সুনাম আবারও সত্যি প্রমাণ করল বসনিয়ার জাতীয় দল, ‘ড্রাগনস’। বিশ্বকাপ প্লে-অফ ফাইনালে ইতালির মতো চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে নাটকীয় টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেছে তারা।

জেনিচা বসনিয়ার একটি নদীতীরবর্তী শহর। ইতালিকে হারানোর দিনে সকাল থেকেই জেনিচা শহর রূপ নেয় এক উৎসবমুখর জনসমুদ্রে। রাজধানী সারায়েভোসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার সমর্থক ছুটে আসেন। ১০ হাজার ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও অসংখ্য মানুষ স্টেডিয়ামের বাইরে, ফ্যান জোনে কিংবা ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় বসে বড় পর্দায় খেলা দেখেছেন।

সমর্থকদের বিশ্বাস ছিল, এই মাঠে কিছু একটা বিশেষ ঘটবেই। অতীতেও নরওয়ে, গ্রিস, রোমানিয়া কিংবা ওয়েলসের মতো শক্তিশালী দলগুলো এখানে হোঁচট খেয়েছে। স্পেন, পর্তুগাল বা নেদারল্যান্ডসের মতো ফুটবল পরাশক্তিরাও এখানে জয় পায়নি।

খেলার আগে এক অনন্য দৃশ্যের জন্ম দেন দলের অভিজ্ঞ অধিনায়ক এদিন জেকো। তিনি সমর্থকদের অনুরোধ করেন ইতালির জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে। ১৯৯৬ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বসনিয়ায় প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে আসা দল ছিল ইতালি। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই উদ্যোগ।

ম্যাচটি ছিল সমানে সমান লড়াইয়ের। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় শেষে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ১-১। এরপর ভাগ্য নির্ধারণের পালা টাইব্রেকারে। চতুর্থ শটে এস্মির বাজরাকতারেভিচ যখন ইতালির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোনারুম্মাকে পরাস্ত করেন, তখনই নিশ্চিত হয়ে যায় বসনিয়ার জয়। মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয় আনন্দ; গ্যালারিতে আগুনের ঝলক, আকাশে আতশবাজি, আর চারদিকে উল্লাসধ্বনি।

স্টেডিয়াম ছাড়িয়ে উদযাপন ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। গাড়ির বহর, পতাকা, হর্নের শব্দে জেনিচা পরিণত হয় এক বিশাল মঞ্চে। পরে সারায়েভোতেও লাখো মানুষের সমাগমে দলের জন্য আয়োজিত হয় সংবর্ধনা। শহরের রাস্তায় তখন গান, উল্লাস আর অশ্রুসিক্ত আনন্দ; যেন বহু বছরের অপেক্ষার অবসান।

এই জয়ের গুরুত্ব শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বসনিয়া এখনও বহন করে সার্বিয়ার সেই আগ্রাসনের ক্ষতচিহ্ন। সারায়েভোর গ্রবাভিচা এলাকার দেয়ালে গুলির দাগ আজও সেই অতীতের সাক্ষী। এদিন জেকোর মতো খেলোয়াড়দের চোখে সেই ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা গেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের জন্য বিশ্বকাপে ওঠা মানে শুধু একটি টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া নয়; এটি জাতীয় পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং অস্তিত্বের প্রতীক।

এই জয়ে যেমন অভিজ্ঞতার ছাপ ছিল, তেমনি ছিল নতুন তারকাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। তরুণ ফরোয়ার্ড কেরিম আলাজবেগোভিচ ইতোমধ্যেই সমর্থকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। ভবিষ্যতে বড় মঞ্চে তার দাপট দেখার অপেক্ষায় সবাই।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ফুটবল ইতিহাস অন্য অনেক দেশের মতো নয়। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেই সময় ফুটবল কার্যত থমকে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৯৬ সালে বসনিয়া তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। ১৯৯৫ সালে ফিফা এবং উয়েফার সদস্যপদ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে বসনিয়া।


বসনিয়ার ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাইলফলক আসে ২০১৪ সালে।  সেবার বিশ্বকাপে তারা প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে। সেই দলটির নেতৃত্বেও ছিলেন এদিন জেকো, সঙ্গে ছিলেন মিরালেম পিয়ানিচ, ভেদাদ ইবিসেভিচদের মতো তারকারা। গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া ও ইরানের সঙ্গে লড়াই করে বসনিয়া। যদিও তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়, তবে ইরানের বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় নিশ্চিত করে।

২০১৪ সালের পর বসনিয়া আর বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি। ইউরোপিয়ান বাছাইপর্বে বারবার ব্যর্থতা, দলগত পরিবর্তন এবং প্রজন্ম বদলের সময় পার করেছে দলটি। কিন্তু বর্তমান দলটি অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার এক চমৎকার মিশ্রণ। ৪০ বছর বয়সী অধিনায়ক জেকো যেমন নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তেমনি কেরিম আলাজবেগোভিচের মতো তরুণরা ভবিষ্যতের আশা জাগাচ্ছেন।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন