বিশ্বকাপের প্রথম চার দশক, যেভাবে তৈরি হলো ফুটবলের মহামঞ্চ
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১২:২৮, ১৩ মে ২০২৬
জুলেরিমে ট্রফি হাতে ব্রাজিলের কিংবদন্তি অধিনায়ক পেলে
ফুটবল বিশ্বকাপের শুরুটা শুধু একটি টুর্নামেন্টের জন্ম নয়, বদলে গিয়েছিল গোটা ফুটবল বিশ্বের গতিপথও। তখন অলিম্পিকই ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলের একমাত্র বড় আসর। কিন্তু ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমেট বুঝতে পেরেছিলেন, ফুটবলের জন্য আলাদা বৈশ্বিক মঞ্চ দরকার। তার স্বপ্ন ছিল আরও বড় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত পেরিয়ে ফুটবলকে ব্যবহার করে দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের সেতুবন্ধন গড়ে তোলা।
সেই ভাবনা থেকেই ১৯৩০ সালে মাঠে গড়ায় প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ। আয়োজক হওয়ার দায়িত্ব পায় উরুগুয়ে, যারা তখন টানা দুইবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। নিজেদের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম শিরোপা জেতে উরুগুয়ে। লা সেলেস্তেদের সেই জয়ই বিশ্বকাপের মহাযাত্রার সূচনা করে।
পরের দুই আসরে আধিপত্য দেখায় ইতালি। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ টানা দুই বিশ্বকাপ জিতে প্রথম দল হিসেবে ব্যাক টু ব্যাক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তি গড়ে আজ্জুরিরা। তবে বিশ্ব ফুটবলের এই উত্থানের মাঝেই নেমে আসে যুদ্ধের অন্ধকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাতিল হয়ে যায় ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ।
যুদ্ধ শেষে ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপ ফিরে আসে নতুন আবহে। আয়োজক ছিল ব্রাজিল। রিও ডি জেনেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে শিরোপা প্রায় ছুঁয়েই ফেলেছিল ব্রাজিল। কিন্তু ফাইনাল রাউন্ডের নির্ধারণী ম্যাচে উরুগুয়ের কাছে হেরে যায় স্বাগতিকেরা। ফুটবল ইতিহাসে সেই হার আজও ‘মারাকানার কান্না’ নামেই পরিচিত।
১৯৫৪ বিশ্বকাপে জন্ম নেয় আরেক কিংবদন্তি গল্প। চার বছর ধরে অপরাজিত থাকা দুর্দান্ত হাংগেরিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি। অথচ গ্রুপ পর্বেই জার্মানদের ৮–৩ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল হাঙ্গেরি। সুইজারল্যান্ডের বার্নে ঘটে যাওয়া সেই অঘটন ফুটবল ইতিহাসে ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে অমর হয়ে আছে।
এরপর শুরু হয় ব্রাজিলের সোনালি যুগ। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে বিশ্ব মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে কিশোর পেলের। তার সঙ্গে গারিঞ্চা ও ভাভদের নিয়ে গড়া প্রজন্ম চার আসরে ব্রাজিলকে এনে দেয় তিনটি বিশ্বকাপ। শুধু শিরোপাই নয়, তাদের নান্দনিক ফুটবল থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘জোগো বোনিতো’ দ্য বিউটিফুল গেম।
এই সময়ের মাঝেই নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে স্বপ্ন পূরণ করে ইংলিশরা।
প্রথম নয়টি বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল নয়টি ভিন্ন দেশ। এর মধ্যে আয়োজক হিসেবে শিরোপা জিতেছে উরুগুয়ে, ইতালি ও ইংল্যান্ড। ইউরোপের পাঁচটি দেশ, দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি দেশ এবং উত্তর আমেরিকার একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মেক্সিকো বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও এই সময়টা ছিল স্মরণীয়। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৩ গোল করে এখনো এক আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ধরে রেখেছেন জাস্ট ফন্টেইন। অন্যদিকে ১৯৬২ বিশ্বকাপে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সর্বোচ্চ গোল ছিল মাত্র চারটি, যা করেছিলেন গারিঞ্চা, ভাভাসহ পাঁচজন ফুটবলার।
বিশ্বকাপ ট্রফির নামও শুরুতে ছিল জুলেরিমে ট্রফি, জুলে রিমের সম্মানে। নিয়ম ছিল, কোনো দল তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারবে। ১৯৭০ সালে তৃতীয় শিরোপা জিতে সেই ট্রফি স্থায়ীভাবে নিয়ে যায় ব্রাজিল। তবে ১৯৮৩ সালে চুরি হয়ে যাওয়া ট্রফিটি আর কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।



