ম্যারাডোনার জাদু, ক্রুইফের আক্ষেপ আর রোনাল্ডোর রহস্যে বিশ্বকাপের নতুন যুগ
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১২:৫৭, ১৩ মে ২০২৬
দিয়াগো ম্যারাডোনা, ইয়োহান ক্রুইফ ও রোনাল্ডো নাজারিও
বিশ্বকাপের প্রথম অধ্যায়ে যেমন ছিল জন্ম ও প্রতিষ্ঠার গল্প, দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে ফুটবল হয়ে ওঠে আরও রঙিন, আরও বৈশ্বিক। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বদলে দিয়েছে ফুটবলের দর্শন, কৌশল ও বাণিজ্যিক পরিধিও। ১৩ দল নিয়ে শুরু হওয়া টুর্নামেন্ট এই সময়েই ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় ৩২ দলের মহাযজ্ঞে।
১৯৭৪ বিশ্বকাপে নতুন এক ফুটবল ধারণা নিয়ে হাজির হয় নেদারল্যান্ডস। ‘টোটাল ফুটবল’ নামে পরিচিত সেই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ। মাঠের যেকোনো জায়গায় খেলোয়াড়দের অবাধ বিচরণ আর পজিশন বদলের এই ফুটবল দ্রুতই মুগ্ধ করে বিশ্বকে। তবে শেষ হাসি হেসেছিল পশ্চিম জার্মানি। নিজেদের মাঠে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে জার্মানরা। সেই দলের অধিনায়ক ফ্রেঞ্চ বেকেন বাওয়ার লিবেরো ভূমিকাও ফুটবলের কৌশলগত চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
চার বছর পরও ভাগ্য সহায় হয়নি ডাচদের। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে আবারও ফাইনালে হেরে যায় তারা। নিজেদের মাটিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টের সেরা তারকা হয়ে ওঠেন মারিও কেম্পাস। সেই আসরে খেলেননি ক্রুইফ। পরিবারসহ অপহরণের ঘটনার কারণে বিশ্বকাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। পরে জাতীয় দলকেও বিদায় জানান ডাচ মহাতারকা।
আশির দশকে এসে বিশ্বকাপ পায় নতুন কাঠামো। ১৯৮২ সালে প্রথমবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪-এ। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা জেতে ইতালি। সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র পাওলো রসি। ম্যাচ ফিক্সিং–সংক্রান্ত মামলায় জেলে যাওয়া রসিকে আবার দলে ফিরিয়েছিল ইতালি। দলের আস্থার প্রতিদান দিয়ে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও জেতেন তিনি।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ যেন পুরোপুরি এক মানুষের গল্প। দিয়াগো ম্যারাডোনার জাদুকরি নৈপুণ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারানোর পথে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনা উপহার দেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দুই মুহূর্ত। প্রথমটি ‘হ্যান্ড অব গড’, আর দ্বিতীয়টি ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। বিতর্ক আর প্রতিভা দুইয়ের সহাবস্থান যেন একসঙ্গেই বহন করেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। সেই আসরের গোল্ডেন বলও ওঠে তাঁর হাতেই।
১৯৯০ বিশ্বকাপকে ধরা হয় সবচেয়ে রক্ষণাত্মক আসরগুলোর একটি হিসেবে। গোলও হয়েছিল কম। তবে এই আসরেই প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ে ক্যামেরুন। আর রজার মিলার হয়ে ওঠেন আফ্রিকান ফুটবলের নতুন প্রতীক। অন্যদিকে টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন দেখা আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি। শেষ বিশ্বকাপে কাঁদতে দেখা যায় ম্যারাডোনাকে।
১৯৯৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ বসে যুক্তরাষ্ট্র। ফুটবলের জন্য তুলনামূলক অচেনা দেশ হলেও দর্শক উপস্থিতিতে রেকর্ড গড়ে সেই আসর। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে নিষ্পত্তি হয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। রবার্তো ব্যাজিওর পেনাল্টি মিসে শিরোপা হারায় ইতালি। আর চতুর্থ বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে আবারও বাড়ে দলের সংখ্যা। এবার তা পৌঁছে যায় ৩২-এ। নিজেদের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। ফাইনালে ব্রাজিলকে হারানোর ম্যাচে জোড়া গোল করেন জিনেদিন জিদান। তবে সেই ফাইনালের আগে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল রোনালদো নাজারিওকে ঘিরে। অসুস্থতার কারণে শুরুর একাদশে না থাকার কথা থাকলেও পরে তাকে খেলানো হয়। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা আছে ফুটবল বিশ্বে। যদিও পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি জিতেছিলেন ব্রাজিলিয়ান ‘ফেনোমেনন’।



